বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
বলা বাহুল্য গত দুইদিন হল আমার মামা ইন্তেকাল করেন। এই মুহূর্থে আমরা ভাইবোনরা যেমন মামাকে হারিয়েছি, আমার মা- খালারা হারিয়েছেন তাদের একমাত্র ভাইকে, মামী হারিয়েছেন স্বামীকে, মামাতো ভাই-বোনরা হারিয়েছে তাদের পিতাকে। সম্পর্কের দিক বিবেচনায় প্রত্যেকের স্থান থেকেই নিজেরা শোকাহত। যদিয় আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানে ঘোষনা করেন ‘কুল্লু নাফসীন জাইকাতুল মাউত‘ – প্রাণি মাত্রই মৃত্যুর স্বাধ গ্রহন করিতে হইবে।
আমরা মানুষরা অনেক সময় এই সত্যকে মেনে নিতে হিমসিম খাই। বিশেষত যখন আপনজনকে হারাই আমরা এতটাই আবেগ আপ্লুত হয়ে পরিযে,
সাধারন ভুল শুদ্ধ বিচার বিবেচনা বোধ হারিয়ে ফেলি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শয়তান আমাদের দ্বারা অনেক ভুল কাজ করিয়ে নেয়। যার অনেক গুলোই আমাদেরকে ইমান ও বিশ্বাস থেকে দূরে ঠেলে দেয়।
পবিত্র কোরআনের ভাষায় শয়তান হল মানুষের জন্য ‘ আদু-উন মুবিন‘- তথা প্রকাশ্য শত্রু। আর শত্রুর পক্ষে শত্রুর ক্ষতি সাধন করাই হল মূল কার্জ। এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে শত্রুর ( শয়তানের) সকল ফিতনা থেকে ইমান আমলের হেফাজত করাই হল ইমানদার হিসেবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
ব্যক্তিগত জিবনে যে কয়জন নিকট আত্বীয় , প্রতিবেশী ও কাছের লোককে মৃত্যু বরণ করতে দেখেছি তার সব কয়টির দাফন প্রকৃয়াতেই সীমা লঙ্গিত ভূল, ভ্রান্ত আকিদা ও বিদআত, কুফরীর ছড়াছড়ি পরিলক্ষিত হয়েছে । অঞ্চল ভেধে এই সীমা লঙ্গনের মাত্রা কোথাও কম, কোথাও বেশী আবার কোথাওবা অনেক বেশী। প্রকাশ্য শত্রু শয়তানের ধোকায় পড়ে আমরা, সদ্য মৃত আপন জনের জন্য ভাল মনে করে তাদেরকে আরো দ্রুত এগিয়ে দেই জাহান্নামের আগুনের দিকে।
বুঝতেই পারিনা এসব অহেতুক অতিরিক্ত কার্জ শয়তানের ধোকা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অতছ শয়তানের এই ধোকা থেকে নিজেদের হেফাজত করাটাই আমাদের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য।
আর এই দায়িত্ব বোধের জায়গা থেকে আমার পরিবার, শোভাকাংখি পাঠকদের সচেতন করার নিমিত্তে আজকের এই প্রয়াস। ইনশা আল্লাহ আমি চেষ্টা করব রাসুল (সা:) এর পবিত্র জীবন ও তার হাদীসের আলোকে মুসলমানের মৃত্যু ও তদপরবর্তি কার্জ সম্পাদনের একটি সংক্ষিপত কার্জ পদ্ধতি তোলে ধরার। আশা করি আল্লাহ আমাকে সাহাজ্য করবেন। এই প্রয়াস চালাতে যদি কোন ক্রুটি ধরা পরে সে জন্য আল্লাহর কাছে প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করে নিচ্ছি। এবং এতে যদি কোন সাওয়াব হয় তার বিনীময় যেন আল্লাহ পাক আমার পিতা মাতাকে সুস্ততার সাথে নেক হায়াত দান করেন,ও সদ্যপ্রয়াত মামা সহ সকল মূর্দেগানকে যেন ক্ষমা করে দেন। পাঠক কোলের কাছে সেই দোয়ার আর্জি রেখে মুল আলোচনায় যাওয়া যাক।
সুস্থতাকে অসুস্থ হওয়ার পূর্বে ও এবং জীবনকে মৃত্যুর পুর্বে মূল্যায়ন করা দরকার।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা: ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম (সা: ) আমার কাধ ধরে বললেন, দুনিয়াতে মুসাফীর কিংবা পথিকের মতো জীবন যাপন কর। সুতরাং আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা: ) বলতেন, যদি সন্ধ্যা উপনিত হয় তাহলে সকালের প্রতিক্ষায় থেকো না। আর যদি সকাল উপনিত হয় তাহলে সন্ধ্যার প্রতিক্ষায় থেকো না। আর সুস্থতাকে অসুস্থ হওয়ার পূর্বে ও জীবনকে মৃত্যুর পুর্বে মুল্যায়ন কর। (সহীহ আল বোখারী, হাদীস নং ৬৪১৬)
অসুস্থ হলে মন খারাপ করা কিংবা রোগকে মন্দ বলা উচিৎ নয়। অসুস্থতা যেমন মানুষের গুনাহ মোচন করে ঠিক তেমনি এটা সম্মান বৃদ্ধি করে।
আরেকটি হাদীস: অসুস্থ সময়ে রুগীর দোয়া কবুল করা হয়:
ইবনে আব্বাস (রা: ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা: ) বলেছেন পাঁচ ব্যাক্তির দোয়া কবুল করা হয়।
১. মজলুমের দোয়া প্রতিশোধের পুর্ব পর্যন্ত।
২. হজ্জ আদায় কারীর দোয়া ঘরে ফেরার আগ পর্যন্ত।
৩. মুজাহিদের দোয়া, ঘরে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত।
৪. অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া , সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত।
৫. এক মুসলিম ভাইয়ের দোয়া, তার অনুপস্থিত আরেক ভাইয়ের জন্য।
অতপর তিনি বলেন এদের মধ্য দ্রুত গ্রহনযোগ্য দোয়া হল মুসলিম ভায়ের দোয়া তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য। ( বুখারী, মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২৬৬০)
মৃত্যুকে ঘৃণা করা যাবে না।
মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রা: ) থেকে বর্ণিত। রাসুল (সা: ) বলেছেন দুটি জিনিশ এমন আছে যাকে মানুষ নিকৃষ্ট মনে করে। তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে, অতছ মৃত্যু তার জন্য ফেতনায় পড়া থেকে অনেক শ্রেয়। সল্প সম্পদকে খারাপ মনে করে, অতছ সল্প সম্পদ তার হিসাবকে হ্রাস করে দেবে। ( আহমদ, সিলসিলায়ে সহীহা, হাদীস নং ৮১৩)
মৃত্যুর আশা করতে পারবেন না।
হযরত আবুহুরায়রা (রা: ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কারীম (সা: ) বলেছেন তোমাদের মধ্য কেউ মৃত্যুর আকাঙ্কা করবে না। যদি সে ভালো হয় তবে সে ভালো কাজ বৃদ্ধি করবে। আর যদি খারাপ হয় তাহলে হয়ত তওবা করবে। ( বুখারী, মুখতাসরিুল সহীহ নুখারী-যবিদি, হাদীস নং: ১৯৬০)
শাহাদাতের মৃত্যুর জন্য আশা ও দোয়া করতে হবে । কারন এটা করা নবীর (সা:) অন্যতম সুন্নাত।
হযরত আবুহুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা: ) ইর্শাদ করেন, সেই সত্ত্বার শপত যার হাতে আমার প্রাণ। আমার আশা হয় আল্লাহর পথে আমাকে শহীদ করা হোক, পুনরায় আবার জীবিত হই এবং আবার আমাকে আল্লাহর পথে শহীদ করা হোক। পুনরায় আবার জীবিত হই এবং আবার আমাকে আল্লাহর পথে শহীদ করা হোক। ( বুখারী, কিতাবুল জিহাদ)
(মৃত্যু ও মৃত সংশ্লিষ্ট:)
মৃতকে চাদর দ্বারা আবৃত করে রাখতে হবে :
হযরত আয়েশা (রা: ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুল এর ওফাত হল। তখন তাকে একটি ইয়ামনি চাদর দ্বারা ঢেকে দেওয়া হল।
( বুখারী, মুখতাসারু সহীহ মুসলীম, আলবানী হাদীস নং ৪৫১)
মৃতের উত্তরসূরীদের উচিৎ, অতি সত্যর মৃতের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া।
হযরত আবুহুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী সা: ইর্শাদ করেছেন, মুমিনের রুহ ততক্ষন পর্যন্ত তার ঋনের সাথে লটকে থাকে। যতক্ষন না তার পক্ষথেকে তা আদায় করা না হয়। ( আহমদ, ইবনে মাজাহ, সহীহ সুনান তিরমিযী ১ম খ-, হাদীস নং ৮৬০)
* এছাড়াও মৃত্যুর সংবাদ পৌছানো সুন্নাত। হাদীস সূত্র বুখারী, মুসলীম, মিশকাতুল মাসাবীহ, কিতাবুল জানাজিয়াহ।
* মৃতব্যক্তির গুনাবলী আলোচনা করা সুন্নাত। হাদীস সূত্র সহীহ সুনান নাসায়ীহ, ২য় খ- হাদীস নং: ১৮২৮ ।
শোকের সময় মৃতের জন্য বিলাপ করা , চিৎকার করে কান্না করা এবং মাতম করা হারাম বা নিষিদ্ধ।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসুল সা: বলেছেন, যে বেক্তি শোকাস্থায় চেহারায় আঘাত হানে, কাপড় ছিড়ে, এবং জাহেলী কথাবার্তা বলে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়। (বুখারী হাদীস নং ১২১২)
আরেকটি হাদীস:
মুগীরা ইবনে শোবা রা: থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, রাসুল সা: বলেন যার উপর বিলাপ করা হয় । তার উপর বিলাপের কারনে আযাব পতিত হয়। (মুসলিম, মুখতাসারু সহীহ বুখারী হাদীস নং ৬৫৬)
আরেকটি হাদীস:
ইবনে ওমর রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন মৃতকে তার পরিবারের বিলাপের কারনে শাস্তি দেওয়া হবে। (মুসলীম, মুখতাসারু সহীহ বুখারী হাদীস নং: ৬৬৩)
মৃতের জন্য ধর্য ধারনের পুরষ্কার হল জান্নাত।
শোক প্রকাশ
শোক প্রকাশ করা সুন্নত। তবে কোন আত্মীয় সজনের জন্য তিন দিনের বেশি শোক প্রকাশ করা যাবে না। এবং স্ত্রী তার সামীর জন্য চার মাস দশ দিনের বেশী শোক পালন করতে পারবে না ।
নবী কারিম সা: এর স্ত্রী উম্মে হাবীবা রা: বলেন। আমি রাসুল সা: কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর উপর, আখেরাতের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী কোন মহিলার জন্য কোন মৃতের উপর তিন দিনের বেশী, এবং তার স্বামীর উপর চার মাস দশ দিনের বেশী শোক পালন করা জায়েজ নয়। (মুসলিম, মুখতাসারুল সহীহ বুখারি, হাদীস নং ৬৫০)।
** আরো একটি হাদীস
আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সা: জাফরের ইন্তিকালের সময় তিন দিন পর্যন্ত লোকজনকে আসা জাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তিন দিন পর নবী সা: তাশরীফ আনলেন। এবং বললেন, আজকের পর থেকে আমার ভাইয়ের উপর শোক প্রকাশ করা হবেনা। ( আবু দাউদ, সহীহ সুনান নাসায়ী, ৩য় খন্ড, হাদীস নং ৪৮২৩)
*** যে ঘরে কেউ মারা যায় সে ঘরে খাবার তৈরী করে দেওয়া সুন্নাত । ( তথ্যশুত্র সুনান ইবনু মাজাহ, প্রথম খণ্ড হাদীস নং ১৩০৬)
শোক পালনের নামে আমাদের সমাজে যে সব সুন্নত বহির্ভূত ভূল প্রথা প্রচলিত আছে:
* শোক পালনের জন্য হাত তোলে দোয়া করা।
* শোক পালনের জন্য হাত তোলে ফাতেহা পাঠ করা।
* মৃতকে গোসল দেয়ার স্থানে স্ত্রীকে গোসল দেয়া।
* মৃত্যুর দিন থেকে তারিখ গননা করে ৩ দিন, ৭ দিন, ৯ দিন, অথবা ৪০ দিনের মাতায় বিভিন্ন খাবার তৈরী করা ও তা বন্টন করা।
* টাকার বিনিময় লোক দিয়ে মৃতের পাশে কোরান খতম করানো।
* মিলাদ মাহফিল করানো।
* মৃতের পাশে আগুন জ্বালানো ।
* উচ্ছশরে শাহাদাত পাঠ করা।
* মৃত্যুর পর শবে বরাত, ঈদ, অথবা মৃত্যু তারিখে শোক পালনের আয়োজন করা।
* হুজুর ডেতে খাওয়ানো।
মৃতকে গোসল দেওয়া সম্পর্কিত :
* গুসল অজু দ্বারা শুরু করতে হবে। তথ্যশুত্র বুখারি, মুসলিম, মিশকাত, তাহকিক আলবানী প্রথম খণ্ড, হাদীস নং:১৬৩৭ ।
* শহীদের জন্য গোসল নেই । তথ্যসূত্র, বুখারি, মুখতাসারু সহীহ বুখারি, যবিদী পৃ: ৬৭৬ ।
* স্বামী তার স্ত্রী, ও স্ত্রী তার সামীকে গোসল দেওয়াতে পারবে। তথ্যসুত্র, সুনান ইবনে মাজাহ, ২য় খণ্ড, হাদীস নং ১১৯৬ ।
কাফন সম্পর্কিত :
* মহিলাদের জন্য পাঁচটি কাপড় ব্যবহার করতে হয়। বুখারী, মুনতাখাল আখবার,প্রথম খ- হাদীস নং ১৮০৪ ।* শহীদের গোসল ও কাফন কোনটার দরকার নেই। সহীহ সুনান আবু দাউদ, ২য় খন্ড, হাদীস নং ২৬৮৮।
* মৃতের সংখ্যার অনুপাতে কাপনের কাপড় কম হলে এক কাপনে একাধিক মৃতকে দাফন দেওয়া যাবে। আহমদ, আবুদাউদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত প্রথম খ- হাদীস নং ১৭০৩।
* কোন অলী, পীর, বুজুর্গ ব্যক্তির পোষাকের কাফন মৃতকে আজাব থেকে বাচাতে পারবে না। তিরমিযী ৩য় খ- হাদীস নং ২৪৭৪।
কাফনের ব্যপারে আমাদের সমাজে যে সব সুন্নত বহির্ভূত ভূল প্রচলিত আছে:
* কাফনের উপর বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, কালেমা তাইয়্যেবা, আহাদ নামা, কোরানের কোন আয়াত অথবা আহলে বাইতের কারো নাম লিখে দেওয়া।
* জমজমের পানি দারা কাফনের কাপড় ধৌত করা।
* মান্য ব্যক্তির কাপড় দ্বরা কাফন তৈরী করি।
* কাফনে সুরমা লেপন করা।
জানাজা সম্পর্কিত:
আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম সা: বলেছেন, জানাজাকে যথাশিগ্র নিয়ে যাও। যদি সে সৎকর্মশীল হয়, তাহলে তাকে ভালোর দিকে অগ্রগামী করলে। আর যদি পাপী হয়, তাহলে তোমাদের কাঁধ থেকে একটা খারাপের বোঝা রেখে দিলে। ( মুসলিম, মুখতাসারু সহীহ বুখারি, হাদীস নং ৬৬৯।
* জানাজার সাথে সাথে যাওয়া এক মুসলিমের উপর আরেক মুসলিমের অধিকার। তথ্যশুত্র বুখারী, মুসলিম, সহীহুল জামে হাদীস নং ৩১৪৫ ।
* মহিলাদের জন্য জানাজার সাথে সাথে না জাওয়া উত্তম । তথ্যশুত্র মুখতাসারু সহীহ বুখারী, যবীদি, হাদীস নং ৬৪৯।
জানাজার সাথে আগুন ও সুগন্ধি নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। জানাজার সাথে উচ্ছস্বরে কালেমা পাঠ করা, জিকির করা, উচ্ছস্বরে কোরানের আয়াত পাঠ করা নিষিদ্ধ।
আবুহুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবী সা: বলেছেন জানাজার সাথে আগুন ও উচ্ছ স্বর যেন না নেওয়া হয়। (আহমদ , আবু দাউদ, আহকামুল জানাজা পৃ: ৭০।)
কাইস ইবনে আব্বাদ রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী কারিম সা: এর সাহাবীগণ জানাজার সাথে উঁচ্ছ স্বর করা অপছন্দ করতেন। ( বায়হাকী, আহকামুল জানাজিয়াহ পৃ: ৭০-৭১)
জানাজা সম্পৃক্ত কিছু ভুল আকীদা। যা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে।
* জানাজার উপর বিভিন্ন নকশা করা, আয়াত খচিত চাদর সহকারে ডেকে দেওয়া।
* পুষ্পমাল্য সহকারে জানাজাকে আবৃত করা।
* ঘর থেকে জানাজা বের করার সময় গুরুত্ম সহকারে দান খয়রাত করা।
* জানাজা বহন কালে কদম গননা করে চলতি পথে বিরতি দেওয়া।
* জানাজা নিয়ে যাওয়ার পূর্বে কোরানের খতম সম্পন্ন করা।
* নেক কারের জানাজা ভারী গুনাহগারের জানাজা হালকা হয় পভৃতির ধারনা পোষন করা।
* দাফনের ব্যবহৃত বাঁশ, চাটাইয়ের সল্পতা হলে মৃতের আমল প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলা।
* মৃতের আমলের উপর কবরের সৌন্দর্য নির্ভর করে এমন ধারনা পোষন করা।
জানাজার সালাত সম্পৃক্ত
জানাজার সালাত আদায় এবং দাফন সম্পন্ন হওয়া অব্দি উপস্থিত থাকার ফজিলত।
আবুহুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা: ইরশাদ করেছেন, যে বেক্তি কারো জানাজায় অংশগ্রহন করবে এবং সালাত আদায় করবে সে এক কীরাত সাওয়াব পাবে। আর যে দাফন হওয়া অব্দি অপেক্ষ করবে সে দুই কীরাত সাওয়াব পাবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল দুই কীরাত অর্থ কি? উত্তওে নবী সা: বলেন দুই কীরাত মানে হল বড় বড় দুইটি পাহাড় সমান সাওয়াব লাভ করবে। (কিতাবুল জানায়েজ)
গায়েবি/ গায়েবানা জানাজা আদায় করা জায়েজ আছে।
আবুহুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সা: লোকদেরকে নাজাশীর মৃত্যুর সংবাদ সেদিনই পৌছে দিলেন, যে দিন সে ইনতেকাল করেছে। তারপর সাহাবীদেরকে নিয়ে ঈদগাহে তাশরীফ করলেন। অতপর তাদেরকে কাতার বন্দি করলেন। এবং চারটি তাকবীর বলে জানাজার সালাত আদায় করলেন। (বুখারী, মুখতাসার সহীহ বুখারী, যবীদি, হাদীস নং ৬৩৮)
জানাজার সালাতে কি পাঠ করবেন।
প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা, দ্বিতীয় তাকবিরের পর দুরুদ, তৃতীয় তাকবিরের পর দোয়া এবং চতুর্থ তাকবিরের পর সালাম ফেরানো সুন্নাত।
ত্বালহা ইবনে আব্দুল্লা রা: থেকে নর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা: ) পেছনে জানাজার সালাত আদায় করেছি। তিনি সূরা ফাতিহার পর অন্য একটি সূরা উচ্ছস্বরে পাঠ করেছেন। যা আমরাও শোনেছি। যখন সালাত সমাপ্ত করলেন আমি তার হাত ধরে কিরাত সম্পর্কে জিজ্ঞেশ করলাম। তিনি বলেন আমি উচ্ছস্বরে সূরা পাঠ করেছি এ জন্য যে, যাতে তোমরা জানতে পার এটা সুন্নাত। (বুখারী, আবু দাউদ, নাসায়ী, আহকামুল জানাইয, আলবানী পৃ:১১৯)
প্রথম তাকবিরের পর ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাত।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম (সা: ) জানাযায় সূরা ফতিহা পাঠ করেছেন। (তিরমিযি, সহীহ সুনানে আবুদাউদ, ১ম খ-, হাদীস নং ১২১৫)
আবু উমামা রা: থেকে বর্লিত। তিনি এক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, জানাজার সালাতে ইমামের জন্য প্রথম তাকবীরের পর চুপে চুপে সূরা ফাতিহা পড়া, দ্বিতীয় তাকবীরের পর রাসুর সা: এর উপর দুরুদ পেশ করা, তৃতীয় তাকবীরের পর ইখলাসের সাথে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, উচ্ছ স্বরে কিছু পাঠ না করা, এবং চতুর্থ তাকবীরের পর সালাম ফেরানো সুন্নাত। (শাফেয়ী, মুসনাদ শাফেয়ী, ১ম খ-- হাদীস নং ৫৮১)।
দুরুদের পর তৃতীয় তাকবীরে নিম্ন দোয়াটি পড়া উত্তম।
হযরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বণিত তিনি বলেন রাসুল সা: জানাজার সালাতে এই দোয়া আদায় করতেন।
হে আল্লাহ আমাদের জিবীত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট এবং বড়, নর এবং নারীদেরকে মাফ কর। হে আল্লাহ আমাদের মধ্য যাদের তুমি জীবিত রেখেছ তাদেরকে ইসলামের উপর জীবিত রাখ। আর যাদেরকে মৃত্যু দান কর তাদেরকে ইমানের উপর মৃত্যু দান করো। হে আল্লাহ আমাদের সাওয়াব থেকে বঞ্চিত কর না। এবং মৃত্যুর পর আমাদেরকে পথভ্রষ্ট কর না। (আহমদ, আবুদাউদ, তিরমিযী, সহীহ সুনান ইবনে মাজাহ- হাদীস নং ১২১৭, মিশকাত হাদীস নং ১২৮৫।)
জানাজার সালাতে প্রত্যেক তাকবীরে হাত উঠানো উত্তম।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি জানাজার সালাতে সকল তাকবীরে হাত উঠাতেন। বুখারী- তা‘লীখ।
জানাজার সালাতে বক্ষে হাত বাধা সুন্নাত।
ত্বাউস রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা: সালাতে ডান হাতকে বাম হাতের উপর শক্ত করে বক্ষে বাধতেন। (সহীহ সুনানে আবু দাউদ, প্রথম খণ্ড, হাদীস নং ৬৮৭)
কবরে লাশ রাখার সময়ের একটি সুন্নত দোয়া।
যরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী কারীম সা: যখন কোন মৃতকে কবরে রাখতেন তখন এই দোয়া পড়তেন।
‘ বিসমিল্লাহী ওয়া আলা মিল্লাতি রাসুলিহী‘- অর্থাৎ আল্লাহর নামে রাসুল সা: এর মিল্লাতে অর্থাৎ তরীকায়/পদ্ধতিতে আমি একে কবরে রাখছি।
অন্য এক বর্ণনায় মিল্লাত শব্দের পরিবর্তে ‘সুন্নাতি রাসুলিল্লাহ‘ শব্দ রয়েছে। (আহমদ, তিরমিযি, সহীহ সুনান ইবনে মাজাহ প্রথম খ- হাদীস নং ১২৬০)
জানাজার সালাত সম্পৃক্ত সমাজে প্রচলিত কিছূ সুন্নাত বহির্ভূত ভূল আকিদা ।
* জানাজার সালাতের পুর্বে উপস্তিত জনতাকে জানাজার নিয়্যাত বলে দেওয়া।
* নিয়্যাত পাঠ করতেই হবে এমন ধারনা পোষন করা।
* জানাজার পরে ও দাফন দেয়ার পুর্বে মৃতের জন্য হাত তোলে সমবেত দোয়া করা।
* জানাজার পর লাশ দাফনে বিলম্ব করা।
* জানাজার পর লাশ সামনে নিয়ে সমাবেশ করা।
কবরকে এক বিগত এর বেশী উচু করা কিংবা পাকা করা যাবে না । বড়ং উচু ও পাকা কবর পেলে তা ধ্বংস তথা মাটির সমান করে দিতে হবে।
সালেহ ইবনে আবি সালিহ রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন আমি নবী কারীম সা: এর কবরকে এক বিগত সমান উঁচু দেখেছি। ( আবু দাউদ, আহকামুল জানায়েয, পৃষ্ঠা নং ১৫৪)
আবুল হাইয়াজ আসাদী রা: থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন আলী রা: আমাকে বলেন। আমিকি তোমাকে সেই কাজের নির্দেশ দেব না ? যার আদেশ নবী সা: আমাকে দিয়েছেন । তাহলে প্রত্যেক ভাষ্কর্য যেনো ধ্বংস করে দেই এবং প্রত্যেক উঁচু কবরকে যেন সমান করে দেই। (আহমদ, আবুদাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, মুখতাসারু সহীহ মুসলীম হাদীস নং ৪৮৮)
তবে কেউ চাইলে কবরের উপর নিদর্শণ স্বরুপ কেবল মাত্র এটি পাথর রেখে দিতে পারে।
আনাস রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলে, নবী কারীম সা: উসমান ইবনে মাযউন এর কবরের উপর নিদর্শন স্বরুপ একটি পাখর রেখেছিলেন। (সহীহ সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১২৬৭)
সুন্নাত দ্বারা প্রমানিত নয়, দাফন সম্পর্কিত যে সকল ভুল প্রথা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে।
* কোন অলী, বুজর্গ বা মুত্তাকী ব্যক্তির পার্শে কবর দেয়ার উদ্দেশ্য লাশ স্থানান্তরিত করা।
* দাফন করার সময় কবরে লাশের মাতার নিচে আরাম দায়ক বস্তু রাখা।
* দাফনের পুর্বে লাশের মাতার পাশে বংশ ধারা লিপিবদ্ধ করে রাখা। এবং এমন আকীদা পোষন করা যে, এ মাধ্যমে শাস্থি হালকা হবে।
* মাটি দেয়ার পুর্বে লাশের মাতার সামনে দাড়িয়ে কোরান খতম দেয়া।
*দাফনের সময় লাশের উপর গোলাপজল ছিটানো।
* লাশের মাতায় বা মাতার কাছে কালেমা, আহাদ নামা, অথবা কোরানের কোন আয়াত লিখে রাখা।
* কবরে মাটি দেয়ার সময় প্রথম মুঠে ‘মিনহা খালাক না হুম‘ দ্বিতীয় মুঠের সাথে ‘ওয়া ফী হা নুঈদুকুম‘ তৃতীয় মুঠের সাথে ‘ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা‘ পাঠ করা।
* লাশ দাফনের পর মাতার দিকে দাড়িয়ে সুরা ফাতিহা, আর পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে সুরা বাকারা পাঠ করা।
* সদ্য কবরের উপর হাত রেখে কবরের সাওয়াল জওয়াব শুর করে পাঠ করা। এবং বাহির থেকে মৃতকে জবাব বলে দেওয়ার চেষ্টা করা। ( এটা বলতে আমার হাসি পাচ্ছে, কারন একবার কিছু ভন্ডকে এমনটা করতে দেখেছি।)
* দাফনের পর শোক পালনের উদ্দ্যেশে কবরে জমায়েত হওয়া।
* কবরে খানা নিয়ে বণ্ঠন করা।
* কবনে বাতি জ্বালিয়ে দেয়া।
* কবরে কুরানখানি করা।
* কবরকে সাজানো, পাকা করা, কাপড় টানিয়ে দেয়া, অথবা যেকোন রঙ্গের পতাকা টানিয়ে দেয়া।
* মৃত্যুর পুর্বে কবর খনন করে রাখা।
সমাপনী:
প্রথমত ব্লগ ভ্রমনের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এখান থেকে যদি জানার মত কিছু পেয়ে থাকেন তাহলে এই ব্লগটি শেয়ারের মাধ্যমে অন্যকে জানার সুযোগ করে দিন।
পরিশেষে বলতে চাই, প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত মতামত থাকে। এক জনের মতের সাথে অন্যের মত পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলিম হিসাবে আমাদের আপোশ করার একমাত্র কেন্দ্র হল কোরান ও হাদীস। উপরোক্ত আলোচনা আমার ব্যক্তি অভিমত নয়। এখানে কেবল মাত্র হাদীসে রাসুল থেকে কিছু বিষয় দৃষ্ঠিপাত করেছি মাত্র।
ইনশাহ আল্লাহ আগামিতে এই ব্লগকে আরো তথ্য সমৃদ্ধ করার চেষ্ঠা করব। এবং তথ্য ও আপনার অভিমত এই মেইলে (forcesyl@gmail.com) প্রদান করে আপনিও সহযোগীতা করতে পারেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাটি ইমান, নির্ভূল জ্ঞান ও বিশুদ্ধ আমলের উপড় টিকে থাকার তাওফিক দান করুন । আমীন।






































